ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান এর বাড়ির কাজ

১. মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি সংবাদিকদের ভূমিকা, (গণমাধ্যম): ১৯৭১
সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক সংবাদকর্মী শহিদ হন।
এরপরও অনেক সংবাদকর্মী নিজের জীবন বাজি রেখে বাইরের
বিভিন্ন দেশ থেকে এসে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ
করেছিলেন এবং তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে প্রকাশ
করেছিলেন। সেসব প্রতিবেদন, আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ
কেবল বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেনি, সময়ের
পরিক্রমায় সেগুলো মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত
হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি সাংবাদিক হিসেবে সাইমন ড্রিং,
মাইকেল লরেন্ট, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, মার্কটালি, সিডনি
শনবার্গ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বিশেষ
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

২. মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনের ভূমিকা,
(গণমাধ্যম) : বিদেশি গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে
বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল যা বিশ্বজনমত গঠনে সহায়তা
করেছিল। এ সকল গণমাধ্যমের দ্বারা পাকিস্তানি হানাদার
বাহিনির গণহত্যার চিত্র, নারীদের নির্যাতন, নৃশংস বর্বরতা,
ধ্বংসযজ্ঞ, শরণার্থীদের দুর্ভোগ সম্পর্কে সংবাদ, আলোকচিত্র ও
ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে বিশ্ববাসী মুক্তিযুদ্ধের
প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরেছে এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা
অর্জন ত্বরান্বিত হয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে
কলকাতা আকাশবাণী, বিবিসি, লন্ডনের ‘দ্য অবজারভার’
ডেইলি টেলিগ্রাফ, টাইম সাময়িকী, নিউজউইক, ডেট্রয়েট ফ্রি
প্রেস, দ্য সানডে টাইমস, দ্য স্পেকটেটর, টরেন্টো টেলিগ্রাম,
দ্য উইকলি নিউএজসহ আরও কিছু উল্লেখযোগ্য গণমাধ্যম
বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়াও রেডিওর বিভিন্ন খবর,
কথিকা, গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ অনুপ্রেরণা ও সাহস
জুগিয়েছিল যা বিজয়ের পথকে সুগম করেছিল।
|||
৩. শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় মূল ভারবহনকারী দেশ ভারত
এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভূমিকা। (মানবিক সহায়তা) :
মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে
আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার সে সময়ে তাদের সাহায্যে
সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তারা বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং
অন্যান্য দেশগুলোতে সাহায্যের আবেদন করেছিল এবং সাড়াও
পেয়েছিল। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটিশ সরকারও বন্ধুর ভূমিকা পালন
করেছিল। তারা বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ দিয়ে সহায়তা
করেছিল। এরপর সোভিয়েত রাশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রেখেছিল। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশ
সাহায্য করেছিল।

৪. প্রবাসী সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক।
(রাজনীতি) : ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর ১০
এপ্রিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠিত হয়। এ সরকার
মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় গঠিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে
তাদের দায়িত্ব পালন সম্ভব ছিল না। তাই ১৭ এপ্রিল শপথ
গ্রহণ করে এ সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে কার্যালয় স্থাপন
করে দিক নির্দেশনামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত। তাই এ
সরকার প্রবাসী সরকার নামে পরিচিত ছিল। এদিক বিবেচনায়
প্রথম দিক থেকেই ভারত সরকার রাজনৈতিক সহযোগিতার
হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৫. মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন এবং বিজয় অর্জন পর্যন্ত তৎকালীন
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্ব ও এতে
দেশটির অবদান। (রাজনীতি) : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের
সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা
গান্ধী। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনে যুগান্তকারী
ভূমিকা পালন করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি বিদেশি
বন্ধু হিসেবে সর্বাত্মক সাথে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি
তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের সর্বত্র
বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন ও রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতা
চেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতা লাভ এবং সাড়া
জাগাতে তিনি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সকল দেশে নিজে গিয়ে সমর্থন
কুড়িয়েছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-
সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদান করে সাড়ে
সাত কোটি বাঙালিকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে ব্যাপক অনুপ্রেরণা
যুগিয়েছিলেন। ৯ মাসব্যাপী এ যুদ্ধে তিনি প্রায় ১ কোটি
বাঙালিকে শরণার্থী হিসেবে নিজের দেশে স্থান দিয়েছিলেন,
তাদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের
মুক্তিযুদ্ধে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা আজীবন স্মরণীয় হয়ে
থাকবে।

৬. জাতিসংঘ ও অন্যান্য বিশ্বসংস্থার ভূমিকা। (কূটনীতি): ১৯৭১
সালে তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব ছিলেন উথান্ট।
জাতিসংঘ পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া
দেখাতে ব্যর্থ হয়। তবে তিনি বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এর ফলে
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে
জাতিসংঘ বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য প্রদান করেন। এছাড়া
ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে নিরাপত্তা
পরিষদের বিশেষ অধিবেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
নিয়ে ভোটাভুটির আয়োজন হয়েছিল যা পরবর্তীতে বিজয়ের
দ্বার উন্মোচন করেছিল। এছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দাতা সংস্থা
যেমন : ইউনিসেফ : সোভিয়েত ইউনিয়ন আর্থিক সহায়তা
প্রদান করেছিল।

07:02
৭. সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য মিত্র দেশের ভূমিকা
(কূটনীতি) : মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপক ভূমিকা
পালন করেছিল। তারা নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও আমেরিকার
বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে
বঙ্গোপসাগরে নৌবহর প্রেরণ করলে সৌভিয়েত রাশিয়াও
তাদের সুসজ্জিত নৌবহর বাংলাদেশের পক্ষে প্রেরণ করেছিল।
এছাড়া মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে ভারত, পোল্যান্ড, নেপাল, ভুটান
অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল।

all vill 26%3

৮. শিল্পী-সাহিত্যিকদের উদ্যোগ (সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র) : মুক্তিযুদ্ধে
শিল্পী সাহিত্যিকদের অবদান ব্যাপক। স্বাধীনতা ঘোষণার পর
চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বেতার কার্যক্রম সরিয়ে
সীমান্ত পেরিয়ে অন্যত্র সরানো হয়। যা স্বাধীন বাংলা বেতার
কেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। এই বেতারের মাধ্যমে সংবাদ,
সম্পাদকীয়, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরের খবর, তাৎক্ষণিকভাবে
রচিত নাটিকা, সংগীত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, নেতাদের ক্রিয়া-
প্রতিক্রিয়া, কবিতা, গীতিনাট্য ইত্যাদি পরিবেশন করা হতো।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা এসব পরিবেশন করতেন।
ভারতের বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ প-িত রবিশংকর ও তার বন্ধু জর্জ
হ্যারিসন শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বিশ্বব্যাপী জনমত
গঠনের জন্য নিউইয়র্কে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন
করেন। যার মাধ্যমে প্রায় ২,৫০,০০০ ডলার সহযোগিতা
পাওয়া গিয়েছিল এবং বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে
পাকিস্তানের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে পেরেছিল।
কাজ : শিক্ষার্থীরা আলোচনা করে অনুসন্ধানের প্রশ্নগুলো ঠিক
করো :
১. মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল শরণার্থী কোথায় এবং কীভাবে
আশ্রয় পেয়েছিল?
২. অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর বিশ্বে
কীভাবে ছড়িয়েছিল?
৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠন ও
মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে কারা সাহায্য করেছিল? এভাবে আমরা
আরও প্রশ্ন তৈরি করব। প্রত্যেক দল নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক
সম্ভাব্য প্রশ্নের তালিকা, তথ্যপ্রাপ্তির উৎসের তালিকা এবং প্রাপ্ত
তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি লিখব।
অনুসন্ধানের জন্য আরও প্রশ্ন :
৪. ভারত কীভাবে সামরিক সহযোগিতা করেছিল?
৫. মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম দেশগুলো কী ভূমিকা পালন করেছিল?
৬. সাধারণ মানুষ কিসের মাধ্যমে এবং কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের
খবর ও তথ্য পেত?
১. মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল শরণার্থী কোথায় এবং কীভাবে
আশ্রয় পেয়েছিল?
উত্তর : মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল শরণার্থী ভারতে আশ্রয়
পেয়েছিল। যদিও সামান্য কিছু মানুষ মায়ানমারে আশ্রয়
নিয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী নৃশংস গণহত্যা শুরু করলে প্রাণ
বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত সরকার
শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দিলে ১ কোটি শরণার্থী ভারতে
আশ্রয় গ্রহণ করে



Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started